শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৭ অপরাহ্ন

দৃষ্টি দিন:
সম্মানিত পাঠক, আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। প্রতিমুহূর্তের সংবাদ জানতে ভিজিট করুন -www.coxsbazarvoice.com, আর নতুন নতুন ভিডিও পেতে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল Cox's Bazar Voice. ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে শেয়ার করুন এবং কমেন্ট করুন। ধন্যবাদ।

বাঁকখালীর জলশয়ে ভাসমান ভেলায় সবুজ ঝিনুক ও কোরাল চাষ: অর্থনীতিতে খুলছে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার

আবদুল আজিজ:
সমুদ্র শুধু মাছ আহরণের উৎস নয়, বরং বিকল্প জীবিকা, খাদ্য উৎপাদন এবং নীল অর্থনীতির (ব্লু-ইকোনমি) নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরী করেছে। কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকায় প্রথমবারের মতো ভাসমান ভেলার মাধ্যমে সবুজ ঝিনুক (গ্রীন মাসেল) ও সামুদ্রিক কোরাল মাছ চাষের উদ্যোগ স্থানীয় বেকার যুবকদের সম্ভাবনার পথ দেখাচ্ছে। পরিবেশবান্ধব এই প্রযুক্তি একদিকে যেমন উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর বিকল্প আয়ের পথ তৈরি করছে, অন্যদিকে দেশের সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহারেরও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।

কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল ইউনিয়নের বাঁকখালী নদীর মোহনা এলাকায় ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলকভাবে গড়ে তোলা হয়েছে ভাসমান ভেলার এই খামার। বাঁশ, দড়ি এবং প্লাস্টিকের ড্রাম দিয়ে তৈরি ভাসমান কাঠামোর নিচে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে সবুজ ঝিনুকের বীজ। জোয়ার-ভাটার প্রাকৃতিক স্রোত ও নোনাজলের অনুকূল পরিবেশে কোনো ধরনের অতিরিক্ত প্রযুক্তি ছাড়াই দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে ঝিনুকগুলো।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, সাধারণত কয়েক মাসের মধ্যেই ঝিনুক বাজারজাত করার উপযোগী হয়ে ওঠে। দেশে পুষ্টিকর সামুদ্রিক খাদ্য হিসেবে এর চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন বাড়ানো গেলে স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

একই সঙ্গে ভাসমান জালের খাঁচায় চাষ করা হচ্ছে উচ্চমূল্যের সামুদ্রিক কোরাল মাছ। ভেলার সঙ্গে সংযুক্ত বড় আকারের জালের খাঁচায় কোরাল মাছের পোনা ছাড়া হয়। নিয়মিত খাদ্য ও পরিচর্যার মাধ্যমে কয়েক মাসের মধ্যেই মাছগুলো বিক্রিযোগ্য আকার ধারণ করে। বাজারে কোরাল মাছের দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় এ খাতে লাভের সম্ভাবনাও উল্লেখযোগ্য বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।

সজুজ ঝিনুক চাষি আনোয়ার মিয়া বলেন-‘ বিগত ২০১৮ সাল থেকে সর্বপ্রথম সবুজ ঝিনুক (গ্রীণ মার্সেল) ভেলায় ভাসমান চাষ শুরু করেন। এতে প্রতিবছর লাভের মুখ দেখেছে। এতে ব্যাপক সফলতা এসেছে। প্রচলিত মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীলতার পাশাপাশি এ ধরনের আধুনিক চাষাবাদ তাদের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে আবহাওয়া বা মৌসুমি নিষেধাজ্ঞার কারণে যখন সমুদ্রে মাছ ধরা সম্ভব হয় না, তখন এই ভাসমান খামারগুলো বিকল্প জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন হিসেবে কাজ করতে পারে।’

আরেক চাষি শহীদুল ইসলাম বাবু কক্সবাজার ভয়েসকে বলেন-“আগে আমরা মূলত মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। কিন্তু. আবহাওয়া খারাপ থাকলে বা মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা এলে আয় বন্ধ হয়ে যেত। এখন ভাসমান ভেলায় ঝিনুক ও কোরাল মাছ চাষ করে নিয়মিত আয় হচ্ছে। সঠিক প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহযোগিতা পেলে এই চাষ আরও বড় পরিসরে করা সম্ভব।”

স্থানীয় চাষী মং ছেন কক্সবাজার ভয়েসকে বলেন, “শুরুতে নতুন প্রযুক্তি হওয়ায় কিছুটা ভয় ছিল। কিন্তু আইডিএফের প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তায় এখন সফলভাবে ঝিনুক ও কোরাল চাষ করছি। বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় পরিবারের আর্থিক অবস্থারও উন্নতি হয়েছে। আরও সহজ শর্তে ঋণ ও বাজারজাতকরণে সহায়তা পেলে অনেক নতুন উদ্যোক্তা এই খাতে এগিয়ে আসবেন।”
প্রকল্পটি অর্থায়ন করছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এবং বাস্তবায়ন করছে ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (আইডিএফ)। প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় চাষিদের প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা এবং আধুনিক সামুদ্রিক চাষাবাদ বিষয়ে সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আইডিএফের মৎস্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাসান কক্সবাজার ভয়েসকে বলেন, “বাংলাদেশে ভাসমান ভেলায় সবুজ ঝিনুক ও সামুদ্রিক মাছ চাষের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। উপকূলীয় এলাকায় পর্যাপ্ত নোনাজল ও অনুকূল পরিবেশ থাকায় এ খাত দ্রুত সম্প্রসারণ করা সম্ভব। সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত সহযোগিতা পাওয়া গেলে এটি উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য একটি লাভজনক ও টেকসই জীবিকার উৎসে পরিণত হবে।”

মুহাম্মদ হাসান আরো বলেন, “বাংলাদেশের দীর্ঘ সমুদ্র উপকূল ও সমুদ্রসম্পদকে কাজে লাগিয়ে ব্লু-ইকোনমির যে পরিকল্পনা সরকার গ্রহণ করেছে, ভাসমান ভেলায় ঝিনুক ও কোরাল মাছ চাষ সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এটি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক অবদান রাখবে।

তিনি বলেন, এ উদ্যোগকে বাণিজ্যিক পর্যায়ে সম্প্রসারণ করতে হলে সহজ শর্তে ঋণ, উন্নত মানের পোনা ও ঝিনুকের বীজ সরবরাহ, নিয়মিত কারিগরি প্রশিক্ষণ, গবেষণা এবং কার্যকর বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সমুদ্রের বুকে ভাসমান এসব খামার ইতোমধ্যেই কক্সবাজারের উপকূলে নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও সরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে ভাসমান ভেলায় সবুজ ঝিনুক ও কোরাল মাছ চাষ বাংলাদেশের নীল অর্থনীতির একটি সফল ও অনুসরণযোগ্য মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

ভয়েস/আআ

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2023
Developed by : JM IT SOLUTION